ইষ্টবেঙ্গলের শতবর্ষে যে ইতিহাস মনে রাখা জরুরি

ফুটবলেরও ধর্ম আছে,সে ধর্মের নাম আবেগ-উন্মাদনা।এই ধর্মের তাগিদেই তো গোটা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ দুর্ভিক্ষ,যুদ্ধ,খরা -বন্যা সবকিছুকে উপেক্ষা করে দলে দলে ছুটে যায় ফুটবল মাঠে,ফুটবলের জাদুতে ভুলে যায় রোজকার জীবনের নানা যন্ত্রনা-হাহাকার।ফুটবলের ধর্ম তাই বিশ্বের অগণিত মানুষের কাছে কঠিন জীবন যুদ্ধের মধ্যেও বেঁচে থাকার রসদ,জীবন সংগ্রামের প্রেরণাও।এই বাংলার মোহনবাগান,ইষ্টবেঙ্গলকে নিয়েও কাজ করে সেই একই প্রেরণা।মোহনবাগানের ১১জন ফুটবলার যখন খালি পায়ে বুট পড়া ইংরেজ ফুটবল টিমকে হারিয়ে দিয়ে রক্তাক্ত হয়ে মাঠ থেকে বেড়িয়ে আসেন,তখন তাঁদের সেই রক্তাক্ত হওয়ার যন্ত্রনা ভারতীয়দের পরাধীনতা ঘোচানোর তাগিদকে আর তীব্র করে তোলে।মোগনবাগানের ১১জন ফুটবলার তখন গোটা দেশের স্বাধীনতাকামীদের প্রেরণা হয়ে ওঠেন।একইভাবে ইষ্টবেঙ্গলও ধারণ করছে এক ইতিহাস।সদ্য শতবর্ষে পা রাখা ক্লাবের সেই ইতিহাসকে মনে করা জরুরি।এ দেশের ইতিহাসে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা দেশভাগ।ওপাড় বাংলা থেকে শয়ে শয়ে মানুষ ছিন্নমূল হয়ে চলে এল এপাড় বাংলায়।উদ্বাস্তু কলোনী জুড়ে বাড়তে থাকল ভিড়।উদ্বাস্তু সমস্যা এক ভয়াবহ আকার নিল বাংলা জুড়ে।সেদিন বাংলার দিকে দিকে ঠাট-বাট পেছনে ফেলে আসা কয়েক হাজার অসহায় পরিবার।সেইসব পরিবার সব খুঁইয়ে চলে এসেছিল এপাড় বাংলায় শুধু প্রাণটুকু সম্বল করে।তারপর শুরু হল তাদের বেঁচে থাকার লড়াই।উদ্বাস্তু কলোনীর একচিলতে ঘর,অনিশ্চিত রোজগার,বর্ষার সময় বাসস্থান আর শৌচালয়ের একাকার হয়ে যাওয়া।চরম এক প্রতিকুলতাকে সঙ্গি করেও চলতে থাকল মানুষের জীবন সংগ্রাম।সেদিন উদ্বাস্তু মানুষগুলির এখানে একমাত্র আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল ইষ্টবেঙ্গল ক্লাব।সব হারানো মানুষগুলোর কাছে ইষ্টবেঙ্গল হয়ে উঠল একমাত্র গর্বের আশ্রয়।খেলার মাঠে ইষ্টবেঙ্গলের লড়াই,ইষ্টবেঙ্গলের সফল হতে চাওয়ার তাগিদের সঙ্গে সেদিন ওপার বাংলার ছিন্নমূল মানুষেরা তাদের জীবন সংগ্রামকে একাত্ম করে নিতে থাকলেন।খেলার মাঠে ইষ্টবেঙ্গলের সাফল্য দেখে কেউ কেউ মাঠের মধ্যেই হয়তো বা দুহাত উপরে তুলে বলে উঠতেন,হইবো আমাগো ও হইবো,এভাবেই হয়তো ফুটবলের লড়াই এসে মিলে গেছিল জীবনের লড়াইয়ের সঙ্গে।

ইষ্টবেঙ্গলের শতবর্ষে তাই ফেলে আসা সেই ইতিহাসকে ছুঁইয়ে দেখতে হবে,ইষ্টবেঙ্গল শুধু একটা নাম নয়,কালের নিয়মে তা একটা প্রেরণাও।ফুটবল শুধু একটা খেলা নয় তার চেয়ে বেশী কিছু।গোটা পৃথিবী জুড়েই তা স্বীকৃত।কে জানতো ব্রাজিলের মত আর্থিকভাবে দূর্বল একটা দেশের নাম যদি ফুটবল না থাকত,যদি পেলে,জিকো নেইমার না থাকতেন?মারাদোনা,মেসি না থাকলে কে চিনতো আর্জেন্টিনার মত একটা দেশকে?বিশ্ব ফুটবলে দাপিয়ে বেড়নো অনেকদেশই এখনও যুদ্ধ বিধ্বস্ত-উদ্বাস্তু সমস্যাজীর্ণ তবু ফুটবল ধর্মে মেতে থেকে সব সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে তারা।ফুটবল তাই শুধু খেলা নয় তার চেয়ে বেশী কিছু,ইষ্টবেঙ্গল ক্লাবের শতবর্ষে এই সত্যটা উপেক্ষিত না থাকাই কাম্য।জানি ফুলবল মাঠেও এখন ক্ষমতা অভিমুখি রাজনীতির থাবা বসছে,ক্ষমতার দড়ি টানাটানিতে মজে গেছেন ক্লাব কর্তা থেকে ফুটবল সংগঠনগুলিও,আর সেই জন্যই তো ফুটবলের ধর্মের উপর রাজনীতির রঙ লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কেউ কেউ।যাঁরা বলছেন পশ্চিমবঙ্গে থেকে কেন ইষ্টবেঙ্গলকে সমর্থন,তাঁরা রাজনীতি চেনেন,জীবন চেনেন না,মানুষের কষ্ট যন্ত্রনা হাহাকার চেনেন না।তাই আমাদের এখন ফুটবলের ধর্মটা এদের সামনে তুলে ধরতে হবে,বলতে হবে ইষ্টবেঙ্গল মানে শুধু,পূর্ব বাংলা নয়, ফুটবল নয়,ইষ্টবেঙ্গল মানে বেঁচে থাকার ইচ্ছেকে জাপটে ধরে অবিরাম লড়ে যাওয়াও,শতবর্ষে এই লড়াইয়ের ইতিহাসে আলো ফেলুক ইষ্টবেঙ্গল। ফুটবল ধর্মের দ্যুতি মুছে দিক সাম্প্রদায়িক ও ক্ষমতামুখি রাজনীতির সব নষ্টামিকে।

,