খিদিরপুরের ৩ ভাইবোনের মৃত্যু ! ভিড়ের মধ্যেও বড় একা

এ যেন ভিড়ের মধ্যেও বড় একা ! তিন-তিনজন মানুষ একটা ঘরে মরে পড়ে রইলেন,কেউ টের পেল না যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের দেহের পচনের গন্ধ ঘরের বাইরে ছড়িয়ে পড়ল।শুক্রবার খিদিরপুর এলাকার একটি বাড়ি থেকে পঁচা গন্ধ বেরুচ্ছে বুঝে স্থানীয় মানুষজন যখন পুলিশকে খবর দিলেন ততক্ষনে ঐ বাড়ির তিনজন সদস্যের মধ্যে দুজনের দেহ একেবারে পচে গলে গেছে,একটি দেহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর জানা যায় সেও মৃত।খবরের সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে খিদিরপুর এলাকার একটি বাড়িতে তিন ভাইবোন একসঙ্গে থাকতেন।কদিন ধরে তাদের কেউ বাইরে বেরুতে দেখেন নি,তারপর শুক্রবার বাড়ির ভেতর থেকে পঁচা গন্ধ পেয়ে প্রতিবেশীরা অনুমান করেন কিছু একটা ঘটেছে।পুলিশি তদন্তে প্রথমিক ভাবে যেটা সামনে আসছে তা হল হয়তো রাতের বেলায় গ্যাস সিলিন্ডার লিক করে ঘরে বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড ছড়িয়ে পড়াতেই এদের মৃত্যু হয়েছে।ঘুমের মধ্যে থাকায় এরা বাঁচার কোন চেষ্টাই করতে পারেন নি বলে মনে করা হচ্ছে।কিন্তু তারপরেও যে প্রশ্নটা থাকে প্রতিবেশীরা পরের দিন বা তার পরের দিনও কেন টের পেলেন না ঐ বাড়ির মানুষগুলো আচমকা স্বাভাবিক জীবনছন্দ থেকে কীভাবে হারিয়ে গেল? আসলে এটাই এখন আমাদের নাগরিক জীবন একাকি নিঃসঙ্গ।হাতে হাত রেখে বেঁধে বেঁধে থাকা নয় এখন আমরা একলা থাকি,সবাই একা।তাই তো একের পর এক ধারাবাহিক ঘটনায় ফুটে উঠতে থাকে এ শহরের নিঃসঙ্গ নাগরিক জীবনের ‘মহাকাব্য।’ এই যেমন মাত্র কিছুদিন আগে দক্ষিণ কলতাকার শুরসুনার এক ফ্যাল্টে এক বৃদ্ধা মায়া চট্টোপাধ্যায় মৃত অবস্থায় তিনদিন পড়ে থাকার পর অবশেষে তার দেহের পচনে প্রতিবেশীরা টের পান তিনি আর নেই।পুলিশ আসার পর জানা যায় মায়াদেবীর পরিবারে আর দুজন সদস্য আছেন।একজন তাঁর স্বামী,যিনি বয়স ও রোগের ভারে শয্যা ছেড়ে উঠতে অপারক,আর একজন মায়াদেবীর বছর পঞ্চাশের একমাত্র কন্যা সন্তান, যিনি মানসিক ভারসাম্যহীন।তিনদিন ধরে মা বিছানা ছেড়ে না উঠলেও যিনি তার বাবাকে বার বার প্রবোদ দিয়ে বলেছেন,মা ঘুমোচ্ছে ঠিক উঠবে,উঠে রান্না করবে,তাঁদের খেতে দেবে।মায়াদেবী আর কোন দিন উঠবেন না,এ শহরের সব নাগরিক তা জেনেছেন,কিন্তু এ শহরের নাগরিক সমাজ যা জানে না তা হল মায়াদেবীর মৃত্যুর পর তাঁর অসুস্থ সারাক্ষণ শয্যায় থাকা স্বামী ও মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে কার বা কাদের আশ্রয়ে থাকবেন?একাকি নিঃসঙ্গ নাগরিক সমাজ কি তাঁদের আর নিঃসঙ্গতার গহ্বরে ঠেলে দেবে?এই নিঃসঙ্গতার গহ্বরে তলিয়ে যাবে আর কত কত মানুষ।আমরা তো বার বার দেখছি নিঃসঙ্গতা জনিত অবসাদের বলি হয়ে কত জীবন ঝড়ে যাচ্ছে অকালে-অসময়ে।এই তো মাত্র একবছর আগে গড়ফা এলাকার এক ফ্ল্যাটে মা মেয়ে ও তাদের নাতি একসঙ্গে ঘুমের অষুধ খেয়ে জীবন থেকে ছুটি নিতে চাইলো,সেখানেও তো কিচ্ছু টের পেল না প্রতিবেশী-পরিজন কেউই।ঘুমের অষুধ খেয়ে আদ্মহত্যা করার আগে সেই পরিবারের সদস্যরা সুইসাইট নোটে লিখেছিলেন তাঁরা বাঁচতে চায় না,তাই কেউ যেন তাঁদের বাঁচাবার চেষ্টা না করে।সেখানেও সেই বাড়ির বৃদ্ধা বাসন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।বসন্তীদেবীর মেয়ে ও নাতিকে কোনক্রণে মৃত্যুর কোল থেকে ফিরিয়ে আনেন ডাক্তাররা।একটু সুস্থ হতেই বাসন্তীদেবীর মেয়ে অনিন্দিতা বসু ডাক্তারের কাছে জানতে চান কেন তাদের বাঁচানো হচ্ছে,কী হবে বেঁচে থেকে?একজন ডাক্তার মূমুর্ষু রোগীকে বাঁচানোর চেষ্টা ছাড়া কী করতে পারেন?

ডাক্তার রোগীকে বাঁচাতে পারেন,কিন্তু অসহায় মানুষকে বেঁচে থাকার প্রেরণা দিতে তো নাগরিক সমাজকে আর সংবেদনশীল আর বিকেক সম্পন্ন হওয়া জরুরি।মানুষের সমস্যায় এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দেওয়া জরুরি,সেই প্রয়াসটা তো আমাদের সমাজ থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে,যে যার নিজের সমস্যা নিয়ে এত ব্যস্ত যে পড়শির ঘরে উঁকি দিয়ে দেখারও ফুসরত নেই।একাকি নাগরিক তাই যখন তখন জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।এমনকী এই তালিকায় শৈশব-কৈশরও এসে পড়ছে।খবরের কাগজের পাতায় চোখ রাখলেই দেখা য়ায় কিশোর-কিশোরীর আত্মহননের সংবাদ।ছোট পরিবারকে আমরা সুখি পরিবার বলে চিহ্নিত করতে ব্যস্ত থেকেছি একসময়,বুঝতে পারিনি আমাদের সেই ছোট পরিবারে কখন সিঁদ কেটে ঢুকে পড়েছে একাকি নিঃসঙ্গতার অসুখ।যে অসুখ আমাদের জীবনকে দুঃর্বিসহ করে তুলতে শুরু করেছে।একা থাকার উদ্দামতার আমরা ভুলে গেছি,বেঁধে বেঁধে থাকার উত্তাপ নিতে,ভুলে গেছি সামাজিক সমস্যাকে মোকাবিলা করতে সমষ্টি শক্তিকেই হাতিয়ার করতে হয়।

আমাদের ক্ষমতামুখি রাজনীতিও আমাদের সামাজিকতা বোধের উন্মেষ ঘটাতে বাধা দেয়,কারণ সংকীর্ণ রাজনীতি মানুষকে একা করে,অসহায় করে তুলতে চায় তাতেই তার লাভ কারণ একা মানুষ খারাপ রাজনীতির কাছে কোন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।তাই নাগরিক নিঃসঙ্গতাকে তরাণ্বিক করতে চায় প্রচলিত রাজনীতি।এই প্রকোপ থেকে বেরুতে তাই আবার আমাদের মানুষের হাত ধরতে হবে,ফিরিয়ে আনতে হবে সেই সংস্কৃতি যে সংস্কৃতির প্রভাবে নাগরিক পড়শির ঘরে উঁকি দেবে,পথ চলতে গিয়ে পড়ে যাওয়া কারোর দিকে বাড়িয়ে দেবে সাহায্যের হাত।পারস্পরিক ভালবাসার বিনিময়ে নাগরিক সমাজ আবার একত্রিত হবে,জোট বাঁধবে।হয়তো সে অনেক দুরের গল্প,হয়তো সে কল্পনাই তবু ধারাবাহিক এই নিঃসঙ্গ নাগরিক বিদায়ের ‘মহাকাব্য’ সমাপ্তির সেটাই হয়তো একমাত্র সান্ত্বনা।

,