কেন অ্যাকাদেমি পুরস্কার প্রত্যাখান করতে চাইছেন ‘স্কুলের রাঁধুনি’ মনোরঞ্জন ব্যাপারী?

তিনি রাঁধেন, তিনি সাহিত্যও রচনা করেন।তাঁর লেখার পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন-সংগ্রাম,নানা চড়াই উতরাই পেড়িয়ে তাঁদের এগিয়ে চলার উপাখ্যান।মাটি আর মানুষই তাঁর লেখার মূল উপাদান।তাঁর সাহিত্যকৃতিকে সম্মান জানিয়ে তাঁকে নানা পুরস্খারে ভূষিত করেছে সরকারি ও বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান।তাঁর কাহিনি নিয়ে সিনেমা তৈরিরও প্রয়াস শুরু হয়েছে সম্প্রতি।সেই তিনিই গত কয়েক মাস ধরে ভয়াবহ এক আর্থিক সংকটে ভুগছেন,সংকট এতটাই যে তিনি চাইছেন তাঁর সাহিত্য প্রতিভাকে স্বীকৃতি জানিয়ে রাজ্য সরকার যে অ্যাকাদেমি পুরস্কার তাঁকে দিয়েছে তা ফিরিয়ে নিয়ে সরকার তাঁর জন্য কোন আর্থিক সুরাহার রাস্তা দেখাক।তিনি মনোরঞ্জন ব্যাপারী।সমাজের একেবারে নিম্ন স্তর থেকে উঠে আসা গল্পকার।উদ্বাস্তু চন্ডাল জীবন বৃত্তান্তের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ।প্রথাগত শিক্ষার বাইরে থেকেই তাঁর শিক্ষা সঞ্চয়,সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস।

সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি মনোরঞ্জন ব্যাপারী দীর্ঘদিন ধরে মুকুন্দপুরের হেলেন কিলার প্রতিষ্ঠানে রান্নার কাজ করে আসছিলেন।প্রতিদিন ১০-১২ ঘন্টা ধরে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে ১০০-১৫০ মানুষের রান্নার দায়িত্ব ছিল তাঁর।কিন্তু কয়েক বছর আগে তাঁর দুই হাঁটুতে সমস্যা দেখা দেয়।হাঁটুর অপারেশন করাতে হয়।তার পর থেকে আর বেশি সময় দঁড়িয়ে থাকতে পারেন না তিনি।শরীরেও নানা সমস্যা দেখা দেওয়ায় চিকিত্সকরা তাঁকে বেশী সময় আগুনের সামনে না থাকার পরামর্শ দেন।গত কয়েক বছর যাবত রাজ্য সরকারের শিক্ষা দপ্তরের বিভিন্ন স্তরে চিঠি দিয়েছেন তিনি,জানিয়েছেন শারীরিক সমস্যার কথা।বলেছেন সরকার তাঁর শরীরের কথা ভেবে তাঁর জন্য অন্য কোন কাজের ব্যবস্থা করুক।কিন্তু মনোরঞ্জনবাবুর আক্ষেপ বার বার বলা সত্ত্বেও সরকার তাঁর বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয় নি।বাধ্য হয়েই অসুস্থ শরীরেই তিনি রান্নার কাজ করে যাচ্ছিলেন।তবে গত জানুয়ারি থেকেই তিনি আর কাজ করতে পারছেন না.তার শরীর রান্নার কাজ করার পক্ষে একেবারেই উপযুক্ত নেই।ডাক্তারদের পরামর্শেই তিনি গত জানুয়ারি থেকে বাড়িতে বসে।এর মধ্যে সরকার তাঁর মাসোয়ারা বন্ধ করে দিয়েছে,আর তাতেই তীব্র আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে,সমাজের একেবারে নীচুতলা থেকে উঠে আসা এই লেখকের পরিবারে।তাঁর স্ত্রী আছে,মেয়ের বিয়ে হলেও ছেলে এখনও ভাল কোন চাকরি জোগাড় করতে পারে নি,তাঁর লেখা থেকে প্রকাশকরা যে অর্থ দেয় তা দিয়েই কোনক্রমে দিন টেনে নিয়ে চলেছেন।

ব্যয়বহুল চিকিত্সা,পরিবারের ভরনপোষণ চালাতে নাজেহাল লেখক,তীব্র হতাশা উগরে দিয়ে বলছেন,’রাজ্য সরকার আমাকে অ্যাকাদেমি দিয়েছে,কী করবো আমি তা দিয়ে?আমার তো খাওয়ার পয়সা নেই,তার চেয়ে ওটা ফিরিয়ে নিয়ে সরকার যদি আমাকে কোন আর্থিক সহায়তা দেয় সেটাই আমার কাছে এখন একমাত্র কাম্য।’মনোরঞ্জন ব্যাপারী জানিয়েছেন বার বার তিনি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তাঁর বিষয়টি জানিয়েছেন,এমনকী তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে পর্যন্ত অনুরোধ করেছেন তাঁর জন্য অন্য কোন কাজের ব্যবস্থা করে দিতে,কিন্তু কোন সুরাহা হয় নি।মনোরঞ্জনবাবু স্বেচ্ছা অবসরের ইচ্ছেও প্রকাশ করেছেন,বলেছেন তাহলেও তিনি কিছু অর্থ পেতে পারেন,কিন্তু তাতেও সাড়া দেয় নি সরকার।তাঁর আরও অভিযোগ তাঁকে বার বার ঘুরতে হয়েছে কখোন বিকাশভবন,কখোন আবার পোদ্দারকোর্ট।

প্রশ্নটা অনেকেরই, কেন একজন লেখককে দিয়ে এভাবে শারীরিক সমস্যা সত্ত্বেও দিনের পর দিন রান্নার কাজ করিয়ে যাওয়া হবে?কেন সরকার এক্ষেত্রে বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করবে না?মনোরঞ্জনবাবু যে কাজ করেন তা যেহেতু রাজ্য সরকারের শিক্ষা দপ্তরের এক্তিয়ার ভুক্ত এক্ষেত্রে শিক্ষা দপ্তর মনোরঞ্জনবাবুকে জানিয়েছেন যে তার কাজের বদল ঘটাবার কোন পদ্ধতি নাকি সরকারি নিয়মে নেই।যুক্তিটি ভারি অদ্ভুদ,যদি কোন লোক অসুস্থ হয়ে পড়েন,বা রান্নার কাজ করার মত শারীরিক পরিশ্রমের কাজে অক্ষম হন তাহলেও তাকে সেই কাজ করেই যেতে হবে এ কেমন নিয়ম?তাছাড়া মনোরঞ্জ ব্যাপারী একজন সাহিত্যিক,তিনি একটু সম্মান-মর্যাদা কি প্রত্যাশা করতে পারেন না?আর একটা কথা এ প্রসঙ্গে বলাই যায়,সমাজের নিচু তলার মানুষের মন জয় করতে সরকারের কত পরিকল্পনা,কত প্রচার,আর সেই নিম্নস্তর থেকে উঠে আসা এক লেখককেই এতটা অমর্যাদা ও অপদস্থ করা,বার্তাটা ভাল যাচ্ছে তো সাধারণ মানুষের কাছে? কলকাতার বাবু সম্প্রদায়ের লেখককুল এখনও চুপ করে থাকবেন?স্কুলের রান্না করা একজন লেখকের এমন হয়রানি নিয়ে তাঁদের কি কিছুই বলার নেই!

,