বাম ছাত্র-যুবদের কথাই বা কেন শুনবেন না দিদি!

0
42

রাজ্য জুড়ে এখন যেদিকেই তাকান,দেখতে পাবেন ‘দিদিকে বলো’শ্লোগান সংবলিত হোর্ডিং।প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শে নতুন করে এ রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি নির্মাণে নাকি তৈরি হয়েছে এই কর্মসূচি।এই কর্মসূচির ভাল-মন্দ,সম্ভব-অসম্ভবতার বিতর্কে না ঢুকে আমরা শুধু এটুকু বলতে পারি,কর্মসূচিটির মধ্যে একটা গণতান্ত্রিক ভবনাকে ধারন করার আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি ফোন করে নিজেদের সমস্যার কথা যে কেউ বলতে পারবেন,এই ব্যবস্থায় সেটা কম কথা নয়।মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনতে তাঁর ফোন নম্বর সকলের কাছে উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন,এই প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে খুবই মানানসই।গত লোকসভা ভোটে এ রাজ্যে বিজেপির অভাবনিয় সাফল্য যদি মুখ্যমন্ত্রীকে মানুষের সঙ্গে আর নিবিড় সখ্য তৈরিতে  তাড়িত করে তাতে তাঁকে বাস্তববোধ সম্পন্ন বলে মেনে নিতে আমাদেরও কোন আপত্তি থাকতে পারে না।তবে খটকা লাগে যখন দেখি একদিকে তিনি মানুষের সঙ্গে সখ্য তৈরির তাগিদে ‘দিদিকে বলো’কর্মসূচি নেন আবার অন্য দিকে বাম ছাত্র-যুবদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব শুধু প্রত্যাখ্যানই করেন না,তাদের নবান্নমুখি মিছিলকে পুলিশ দিয়ে রক্তাক্ত করে দেন।ডিওয়াইএফের রাজ্য সভানেত্রী পরিষ্কার জানিয়েছেন তাঁরা বার বার মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে বলেছিলেন একবার দেখা করে মুখ্যমন্ত্রীতে ডেপুটেশন দিতে চান তাঁরা।রাজ্যে বেড়ে চলা বেকারি,শিক্ষার অনিশ্চয়তা,আর শিল্প সংস্থা তৈরিতে যে ভাটা পড়েছে তাতে বাম যুব ছাত্রদের প্রতিবাদ আছে,রাজ্য সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যানের বাইরে কিছু পাল্টা পরিসংখ্যানও আছে সে সব তারা রাজ্য প্রশাসনের সদর দপ্তর নবান্নে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন।মুখ্যমন্ত্রী কেন শুনবেন না তাঁদের কথা,কেন তাঁদের পুলিশ দিয়ে মেরে রক্তাক্ত করবেন?এ রাজ্যের একদল ছাত্র যুবককে প্রকাশ্য রাস্তায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার অপরাধে যে মুখ্যমন্ত্রী পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন,তারপর তাদের গ্রেপ্তার করেন,কোন মুখে তিনি গণতন্ত্রের কথা বলেন?কোন মুখে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের গণতন্ত্র হরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বণিত করতে পারেন?

আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্যা তিনি নিজেই,তাঁর মুখ আর মুখোশের ব্যবধান অনেকটাই।তাই বার বার সামনে চলে আসে তাঁর দ্বিচারিতা।তাঁর দলে তিনিই সব,তাঁর কথাই তাঁর দলের আদর্শ-আইন-তথ্য-তত্ত্ব সবকিছু।মুসকিল হল,এরকম ভাবনা অভ্যেস করতে গিয়ে তিনি ব্যবস্থাপনারও উর্দ্ধে নিজেকে স্থান দিয়ে দেন তাই বুঝতে পারেন না গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কতগুলো রীতি নীতি আছে,যা ব্যক্তির চেয়েও বড়।মুখ্যমন্ত্রী পদটি কোন রাজনৈতিক পদ নয়,সেটা একটা সাংবিধানিক পদ,সেখানে বসলে সবার কথা শুনতে হয়।তিনি যে আসলে বাম যুব ছাত্র নেতাদেরও মুখ্যমন্ত্রী সেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বোধে ধরা পড়ে না,তাই একটা গণতান্ত্রিক পদে বসে চুড়ান্ত স্বৈরাচারি আচরণ করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটুও কুন্ঠা হয় না।সেদিন বাম যুব ছাত্রদের মিছিলে যেভাবে আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে তাতে  নিশ্চিত করে বলা যায় পুলিশ প্রশাসনের কাছে নির্দেশ ছিল যে কোন উপায় মিছিল আটকে দিতে হবে।যদি মিছিল নবান্নে যেত যদি তারা মুখ্যমন্ত্রী বা প্রশাসনের কারোর সঙ্গে কথা বলতে পারতেন তাতে কী এমন ক্ষতি হত!সরকার পক্ষ ভেবে দেখতে পারেন তাতে তাদের ভাবমূর্তি আর ভাল হত,সহনশীল সংবেদনশীল প্রশাসন বলে তাদের চিনতো এমনকী বাম যুব ছাত্ররাও।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে রাস্তায় হাঁটলেন না,তিনি বল প্রয়োগ করলেন,ছাত্রদের মাথা ফাাটালেন,রক্তাক্ত করলেন,কিছুজনকে গ্রেপ্তার করলেন।ক্ষমতার ভাষায় কথা বললেন ‘গণতান্ত্রিক’প্রশাসক।আন্দোলনের অস্ত্র হাতে তুলে দিলেন বাম ছাত্র যুবদের।মুখ্যমন্ত্রী নিজের গণতান্ত্রিক মুখোশ নিজেই খুলে ফেললেন,বুঝিয়ে দিলেন ‘দিদিকে বলো’টা আসলে তাঁর অনেক নাটকের মতই আর একটা নাটকই।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিবছর ২১ জুলাই পালন করেন,দিনটির তাত্পর্য বলতে বার বার বলেন,গণতান্ত্রীক আন্দোলনের উপর পুলিশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধাচারণ।ভাবলে অবাক হতে হয় যিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শহিদ দিবস পালন করেন তিনিই আবার গণতান্ত্রিক আন্দোলন আটকাতে পুলিশকে লেলিয়ে দেন।বাম যুব ছাত্রদের নবান্ন অভিযানে পুলিশি আক্রমণের পক্ষে সাফাই দিতে গিয়ে রাজ্য মন্ত্রী সভার সদস্য তাপস রায় সেদিন বললেন রাজ্যের প্রশাসনিক ভবন দখল করতে চাইলে পুলিশকে তো ব্যবস্থা নিতেই হবে।কী আশ্চর্ষ ভাবুন,১৯৯৩ এ ২১ জুলাই যখন জ্যোতি বসু বলেছিলেন রাইটার্স দখল করতে এসেছিল ওরা তাই পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে।জ্যোতি বসু সেদিন ঠিক কথা বলেন নি,আসলে গণতান্ত্রিক ব্যস্থায় ওভাবে রাইটার্স দখল করা যায় না,পুলিশের অন্যায় কাজের সাফাই দিতে গিয়ে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে জ্যোতি বসু সেদিন ভুল কথা বলেছিলেন,আর আজ সেই একই ভুল কথার পুনরুচ্চারণ করছেন রাজ্যের এক মন্ত্রী,যারা নাকি আবার ২১ জুলাইকে শহীদ দিবসের সর্যাদা দেয় বলে দাবি করেন।এতটা ভন্ডামি গণতন্ত্রে সইবে তো!!