সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা দেশদ্রোহ হয় কোন যুক্তিতে?

0
26

দেশের সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মাস কয়েক আগে প্রখ্যাত সিনেমা পরিচালক শ্যাম বেনেগাল,অপর্ণা সেন,সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত অভিনেতা সহ দেশের ৪৯ জন স্বনামখ্যাত ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি লেখেন।সেই চিঠিতে তাঁরা দেশের প্রধান প্রশাসকের কাছে আবেদন করে বলেছিলেন,দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে ধর্মীয় বিভেদ তৈরি হচ্ছে,যেভাবে একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ গণপিটুনির শিকার হচ্ছেন,তাতে তাঁরা খুবই উদ্বিগ্ন।প্রধানমন্ত্রী যেন গোটা বিষয়টি গুরুত্ব নিয়ে বিবেচনা করেন।এঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন রেখেছিলেন তিনি যেন সমস্ত রাজনৈতিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে এদেশের ধর্ম নিরপেক্ষ সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে বজায় রাখতে প্রয়াসী হন।এঁরা এদের চিঠিতে কোথায় কোথায় গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে তার একটা তালিকাও দিয়েছিলেন।এটাও জানিয়েছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘটনা গুলি ছড়িয়ে পড়ায় দেশের মানুষের বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষজনদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে যা সাম্প্রদায়িক বিভেদের পরিসর বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে।প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অবস্থান ও আবেদনই এই পরিস্থিতি মোকাবিলার উপযুক্ত হাতিয়ার হতে পারে বলেএঁরা চিঠিতে আবেদন রেখেছিলেন।

এই সাধারণ একটা চিঠির বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় দেশ জোড়া বিতর্ক।কেন্দ্রীয় শাসক দলের লোকজন অভিযোগ করতে থাকেন এইসব বিশিষ্টজনরা ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চক্রান্ত করতেই এই চিঠি লিখেছেন।শাসক দল তাদের ঘনিষ্ট মিডিয়াকে ব্যবহার করে এই সব বিশিষ্টজনদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কুত্সা করতে শুরু করে।এমনকী কেন্দ্রীয় শাসক ঘনিষ্ট একদল সেলিব্রিটিদের দিয়েও কেন্দ্রীয় শাসক দলের প্রশংসা করে চিঠি লেখানো হয়।সেই চিঠিতে তীব্র কটাক্ষ করা হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়,শ্যাম বেনেগালদের মত ব্যক্তিদের।সেখানেও থেমে না থেকে অবশেষে দিন কয়েক আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠি লেখার কারণে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়,অপর্ণা সেনদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

ভেবে আশ্চর্য লাগে গণতান্ত্রিক বোধের যাবতীয় রীতি কি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এ দেশ থেকে?তা না হলে সামাজিক বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ কোন যুক্তিতে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে গণ্য হয়?দেশের প্রধানমন্ত্রী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি।তিনি এদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান প্রশাসক।কোন গুরুতর সমস্যা হলে তাঁর কাছেই তো আবেদন করতে হবে,তাঁর দৃষ্টিই তো প্রথমে আকর্ষণ করতে হবে।সেই প্রয়াসই তো করেছেন সৌমিত্র অপর্ণারা।এতে অন্যায় কোথায়,অপরাধটাই বা কোথায়?চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী যদি পাল্টা যুক্তি ও পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারতেন যে সৌমিত্রবাবুদের উদ্বেগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত,তাঁদের বর্ণিত ঘটনাগুলো আদৌ ঘটে নি,সবটাই বানানো,তাহলে না হয় মানা যেত যে বিশিষ্টজনরা চক্রান্ত করছে।কিন্তু চিঠির বিষয়বস্তুর সত্যতা নিয়ে কোন কথা না বলে যেভাবে পাল্টা যুক্তি সাজানো হচ্ছে তাতে তো মনে হয় যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে বলে মনে করছে সরকার।যে বা যাঁরা এই চিঠির বিরুদ্ধে একেবারে রে-রে করে উঠছেন তাঁরা ভেবে দেখুন তো,যদি এমটা হোত যে প্রধানমন্ত্রী এই চিঠি পাওয়ার পরেই সৌমিত্র-অপর্ণা সেনদের ডেকে কথা বলতেন।যদি বলতেন,আপনাদের উদ্বেগ আমাকেও স্পর্শ করেছে,ভাববেন না এমনটা ঘটে থাকলে অবশ্যই প্রশাসনকে বলবো উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে।যদি সৌমিত্র শ্যাম বেনেগালদের সামনে দাঁড়িয়ে আশ্বাস দিতেন,আপনাদের কথা দিলাম এ দেশের ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শ কোনভাবেই ক্ষুন্ন হতে দেবো না।তবে কি প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি,তাঁর দলের ভাবমূর্তি ও এদেশের গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি আর বেশী উজ্জ্বল হয়ে উঠতো না?আসলে বোধ বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে শাসকের,গণতন্ত্রের নাটকটাও আর করা যাচ্ছে না।সব মুখোশ খশে যাচ্ছে,বেরিয়ে পড়ছে হিংস্রতা।দেশপ্রেমের নামে এই হিংস্রতাকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে সমাজের সর্বত্র।সৌমিত্র-শ্যাম বেনেগাল অপর্ণা সেনদের দেশদ্রোহী প্রতিপন্ন করার চেষ্টা আসলে সেই হিংস্রতারই প্রতিফলন।