অভিজিতের ধুতি, এস্থার শাড়িঃ বাঙালিয়ানা নাকি অন্যকিছু !

0
184

অনুপম কাঞ্জিলালঃ অভিজিত বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী এস্থার দুফলো মঙ্গলবার নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন।বাংলা সংবাদ মাধ্যম প্রায় সারাদিন ধরে সেই অনুষ্ঠান নিয়ে আবেগবিহ্বল সংবাদ ভা্ষ্য তৈরিতে ব্যস্ত ছিল। হবারই কথা একজন বাঙালির ( অভিজিত এখন নাগরিকতা সূত্রে মার্কিনি)এমন গর্বিত হওয়ার মত সাফল্যকে সকলের গোচরে আনার দায় কেনই বা এড়িয়ে যাবে বাংলা সংবাদ জগত।অভিজিত বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও যে বাঙালি পরিচয়কে প্রাধান্য দিতে খুবই উতসাহী ছিলেন তা তাঁর পোশাকই বলে দিচ্ছিল।ধূতি পাঞ্জাবির উপর কোর্ট চাপিয়ে বাঙালি মোড়কে নিজেকে সাজিয়ে তুলতে নিশ্চয়ই তাঁকে বেশ কিছুটা সময় ব্যয় করতে হয়েছিল। অভিজিত বিনায়ক নিজেই শুধুমাত্র নন তাঁর স্ত্রী এস্থার দুফলোকেও দেখা গেল বাঙালি মহিলাদের মত শাড়ি ব্লাউজ পড়ে নোবেল প্রাপ্তির অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন। বেশ লাগছিল দুজনকে।আর এই ‘বেশ লাগার’ঘোর কাটতেই বেয়ারা কিছু প্রশ্ন আমাদের মাথার মধ্যে ঘুরতে শুরু করল।আচ্ছা অভিজিত-এস্থার গোটা দুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন তো তাদের ব্যতিক্রমি কাজের নিরিখে,অন্তত তেমনটাই তো বলা হচ্ছে।অথচ বাঙালি মোড়ক নিয়ে তাঁদের মধ্যে এতটা আগ্রহ ঢুকিয়ে দিল কে বা কারা?কোন সন্দেহ নেই কে কোন পোষাক পরবেন সেটা তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছে অনিচ্ছের উপরই নির্ভর করে।এক্ষেত্রে অভিজিত-এস্থাররা কি তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছে দ্বারা তাড়িত হয়ে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে বাঙালি পোষাকের প্রতি এতটা আগ্রহ দেখালেন,নাকি তদের উপর কোন না কোন ভাবে বাঙালিয়ানার মোড়ক চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রয়াস কাজ করেছে?

এস্থার দুফলো এ রাজ্যে যখন এসেছিলেন তখনও শাড়ি পড়ে কোথাও গেছেন এমন শোনা যায় নি,এমনকী নোবেল পদক নেওয়ার ঠিক অাগের দিনে নিজের কিছু কথা বলার সময় তাঁকে দেখা গেল পাশ্চাত্য পোষাকেই, সেই তিনি নোবেল পদক নেওয়ার অনুষ্ঠানে ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত স্বামীর পাশে একেবারে বাঙালি বধুর সাজে।পুরোদস্তুর একটা বাঙালি ফ্রেম।আমাদের প্রশ্ন এই ফ্রেমটা বানানো হল না তো?  যে মানুষটা দীর্ঘ দিনের অভ্যেস হেতু পাশ্চাত্য পোষাকেই স্বচ্ছন্দ তাকে বাঙালি বরের পাশে মানানসই হতেই কি শাডি ব্লাউজের মোড়ক চাপাতে কোনভাবে চাপ দেওয়া হল? কেউ দিল কি ? যে অনুষ্ঠানে বোধ আর চেতনার চর্চা হওয়ার কথা সেখানেও বাহ্যিক মোড়ক এতটা গুরুত্ব পেয়ে গেলে তো খুব ভয়ের কথা। ভয় কারণ এখন আমরা সবকিছুতেই মোড়কের মোহে বিভ্রান্ত হই।বোধ আর চেতনার মূল্যায়ন ছেড়ে মোড়কের পেছনে ধাবিত হতে থাকা বাঙালিকে নোবেল জয়ী অভিজিত বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ও যদি শুধুমাত্র মোড়ক নিয়ে চর্চাতেই ব্যস্ত থাকতে রসদ জোগাতে থাকেন তবে তা খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়।
ধরুন যদি এমনটা হত,নোবেল প্রাপ্তির এই অনুষ্ঠানে এস্থার দুফলোর পছন্দের পোষাক পরে হাজির হতেন অভিজিত বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।এস্থার সংবাদ মাধ্যমকে জানাতেন অভিজিত আজ আমার প্রদেশের পরিচিত পোষাক পরেছেন,আমার পরামর্শে।তবে কি বাঙালির নোবেল জয়ের গর্বে টোল পড়ত?আমরা মনে করি না,তাতে বরং বাঙালি মননের উদারতা আর বেশী করে ছড়িয়ে পড়ত।মহিলাদের পোষাক নির্বাচনে পুরুষের প্রাধান্য বা প্রভাব বিস্তারের চিরাচরিত গল্পে আসতে পারতো নতুন ট্যুইস্ট।অভিজিত বিনায়কের সমাজ ভাবনা নিয়ে অন্য পরিসরে আগ্রহ তৈরি হত কিছু মানুষের।কিন্তু না,এক্ষেত্রে তেমন কিছু হল না।নোবেল প্রাপ্তির অনুষ্টানেও বাহ্যিক মোড়ক নিয়ে চর্চার অনেকটা সুযোগ করে দিলেন অভিজিত এস্থার নিজেরাই।নোবেলজয়ী অভিজিত এস্থার নিশ্চয়ই জানেন আন্তরিতকার ছোঁয়া না পেলে কোন কাজই প্রাণ পায় না।বাঙালিয়ানা আসলে একটা বোধ ও সংস্কৃতির বিষয়,পোষাকের মোড়ক দিয়ে তাকে যারা চেনাতে চান তারা আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চান,ঠকাতে চান।নোবেল প্রাপ্তির অনুষ্ঠানে এস্থার শাড়ি পড়া বাঙালিয়ানা বড় আরোপিত বলে মনে হচ্ছিল। বোধ আর চেতনার চর্চা করা অভিজিত এস্থাররা এই মোড়কের মোহ থেকে পরবর্তী সময়ে দূরে থাকবেন বলেই প্রত্যাশা করা যায়।

অভিজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নোবেল প্রাপ্তি ও বাঙালি অাবেগ