আপনি বিশ্রাম নিন সুনন্দ সান্যাল,কেউ কেউ নিশ্চয়ই জেগে থাকবে

0
600

অনুপম কাঞ্জিলালঃ-৩৪ বছরের বাম শাসনের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের আওয়াজ তুলতে বিশিষ্টজনদের মধ্যে তাঁর ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে সক্রিয়।আবার বাম শাসনের  পরিবর্তনের পর তৃণমূল সরকারের নানা কাজের সমালোচনা শুরু করতে সময় ব্যয় করেন নি তিনি।চারপাশের ঘটনার ঘাত প্রতিঘাত বার বার তাঁকে নাড়া দিয়ে গেছে,তাঁর কপালে এঁকে দিয়ে গেছে চিন্তার বলিরেখা।তাই বয়সের ভারকে অস্বীকার করে বার বার তিনি পথে নেমেছেন।বামেদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেমন নিজের বিবেকের ডাকে মমতাকে সঙ্গ দিয়েছেন তেমনি আবার মমতার স্বৈরাচার ও দুর্নীতির প্রতিবাদে বামেদের সঙ্গে পথে নামতে একটুও সংকোচ করেন নি।তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী সুনন্দ সান্যাল,এখন সমস্ত চারপাশের ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাত থেকে অনেক দূরে।এখন আর তাঁর বোধ কাজ করে না।কাউকে আর চিনতে পারেন না তিনি,কথাও বলতে পারেন না।শুধু কেউ গেলে হা করে তাকিয়ে থাকেন।এক সময় বোধ ও চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষটা এখন একেবারেই জড়ভরত অবস্থায় টিকে আছেন।স্ত্রী গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে,একমাত্র পুত্র বিদেশে কর্মরত।অসুস্থ অথর্ব বোধশক্তিহীন মানুষটাকে দেখভাল করেন গৃহ পরিচারিকা। মাঝেমধ্যে পুত্র আসেন চিকিত্সকের ব্যবস্থাও আছে নিয়মিত তবু মানুষটার বর্তমান পরিণতি দেখলে ভেতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে।মনে হয়  সুনল্দ সান্যাল এখন শুধুই স্মৃতী হয়ে বেঁচে আছেন।

  মনে আছে  দলতন্ত্রের নাগপাশ থেকে বের করে আনতে তিনিই সবার আগে নাগরিক সমাজকে সংগঠিত করার কাজ শুরু করেছিলেন।তিনিই সোচ্চারে বলতেন নাগরিক সমাজ কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা ধরবে না।তাঁর মত ছিল সচেতন-দায়বদ্ধ নাগরিক সমাজই পারে রাজনৈতিক দলগুলির অনৈতিক আগ্রাসন রুখে দিতে।সেই কারণেই এ রাজ্যে পরিবর্তনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবার পর কোন সরকারি পদ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন।২০১১ তে এ রাজ্যে বাম সরকার সরে যাবার পরেই পরিবর্তনপন্থী অধিকাংশ বিশিষ্টজনই যখন নাগরিক সমাজের সঙ্গে দুরত্ব তৈরি করে রাতারাতি সরকারি পদ ও সুযোগ নেওয়ার জন্য হামলে পড়লেন,তখন তিনি বার বার সাবধান করে বলে ছিলেন এর ফলে নাগরিক সমাজের আন্দোলন দূর্বল হবে।সরকারের সঙ্গে সখ্য তৈরি করা বিশিষ্টজনেরা সরকারের সমালোচনা করার নৈতিকতা হারাবেন।মানুষের কাছে এঁদের বিশ্বাস যোগ্যতাও নষ্ট হতে থাকবে।তাঁর সেই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে,গড়পড়তা মানুষজনও এখন এ রাজ্যের বিশিষ্টজনদের ভূমিকা নিয়ে হাসাহাসি করেন।সুনন্দ সান্যাল কিন্তু নিজের ভূমিকায় অবিচল ছিলেন বাম শাসনের পরিবর্তের পরেও।চিটফান্ড নিয়ে তিনি বর্তমান তৃণমূল সরকারের ভূমিকার তীব্র বিরোধিতা করতে থাকেন প্রথম থেকেই।মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক সময় সমর্থন করলেও তিনি যথন ক্ষমতায় বসেই বিরুদ্ধ স্বর শোনার ধৈর্য্য হারাতে থাকেন তখনই সুনন্দ সান্যাল প্রতিবাদ করে বলেন বিরুদ্ধ স্বর না শুনতে চাওয়া স্বৈরাচারের লক্ষণ।সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার বিরল সাহস ধারন করতেন সুনল্দবাবু তাই এক সময় একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য রাখলেও তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের নেত্রী দোলা সেন সম্পর্কে পরবর্তী সময় তিনি তীব্র কটাক্ষ হেনে বলতে দ্বিধা করেন নি যে দোলা সেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গা থেকে তোলা আদায়ের যে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে তাতে মনে হয় ওর নামটা দোলা সেন না হয়ে তোলা সেন হলেই যথার্থ হোত।কথা ও কাজে কোন ফারাক রাখেন নি সুনন্দ সান্যাল।ক্ষমতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চাইতেন  সুনন্দ সান্যাল। যখন এ রাজ্যে বাম সরকারের পরাজয় সুনিশ্চিত হয়ে গেছে বুঝতে পেরে  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাকে শিক্ষামন্ত্রী করার কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন,সেই রকম একটা সময় একটা সংবাদ চ্যানেল থেকে ফোন করে সুনন্দবাবুকে আচমকা লাইভ সংবাদে জিজ্ঞাসা করা হয় তিনি শিক্ষামন্ত্রী হলে প্রথমে কোন কোন বিষয়গুলির উপর জোর দেবেন?সুনন্দ সান্যাল এই প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার জানিয়ে দেন তাকে শিক্ষা মন্ত্রী করা হলে তিনি প্রথমে যে কাজটা করবেন তা হল শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেবেন।অনেকে বলেন সুনন্দবাবুর এই মানসিকতা বুঝেই তাতে আর কোন মন্ত্রী করার ভাবনা ভাবেন নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

   সুনন্দ সান্যাল তার অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন বার বার।নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন,বিশিষ্টজনদের নিয়ে এ রাজ্যে বাম শাসনের শেষ দিকে যে নাগরিক সমাজ জাগরনের কাজ শুরু হয়েছিল তা যেন সক্রিয় থাকে।তাঁর সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় নি,এ রাজ্যে ক্ষমতার বদল হবার সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের অনেকেই ক্ষমতার মুখ হয়ে ওঠার আগ্রহ তাড়িত হয়ে পড়েন,তাদের আগ্রহ দেখে মমতাও তাদের ক্ষমতার অলিন্দে টেনে নেন,বন্ধ করে দেন তাদের শাসক বিরোধী স্বর।তারা এখন ক্ষমতার স্বরে ও শাসকের স্বরে কথা বলেন।সুনন্দ সান্যাল আবার একা হয়ে যান কিন্তু যতক্ষণ শরীর মন সঙ্গ দিয়েছে ততক্ষন তিনি নাগরিক সচেতনতার কাজই করে গেছেন নিরলসভাবে।আজ যখন সমাজজুরে চুড়ান্ত বিশ্বাসহীনতার আবহ,যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরির এক ভয়াবহ প্রস্তুতি চলছে তখন নাগরিককে সচেতন করার কাজে যিনি সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে পারতেন তিনি সব কিছু থেকে অনেক দূরে,একাকী উদাসী চোখে তাকিয়ে আছেন।এ বড় কষ্টের কথা,বড় আক্ষেপের কথা।অসুখ তার থেকে সব কেড়ে নিয়েছে তবু সুনন্দ সান্যালের নীরব দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন বার বার মনে পড়ছিল আমার টক শো গুলোতে এসে তিনি যেভাবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বার্তা দিতেন আজও কি তেমন কিছু বলতে চাইছেন তিনি?তাঁর চোখের দৃষ্টি পড়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম নিরুচ্চারে কি বলতে চাইছেন,”আমার যতটা করার আমি করেছি এবার তোমরা একটু দেখ সমাজটাকে,একটু পরিচর্যা করো।মানুষ বড় কষ্টে আছে মানুষের হাতটা একটু ধরো কেমন!”আমার মনে আছে সুনন্দদা(পিতৃ-তুল্য হলেও আপনাকে তো দাদা বলেই ডাকি) কথা বলার ক্ষমতা যখন ছিল শেষবার আপনি এই কথাটাই আমাকে বলেছিলেন।আপনার নীরব দৃষ্টিতে আমি আবার সেই কথাটাই পড়লাম।আপনি বিশ্রাম নিন সুনন্দ সান্যাল,কেউ কেউ নিশ্চয়ই জেগে থাকবে।