করনো অাবহে অাজ মুখোমুখি  দাঁড়িয়েছে দুটো ভারত

0
92

সম্পাদকীয়ঃ কেউ কেউ ভেবেছিলেন,এই ভয়াবহ সময়ে যখন গোটা পৃথিবীকে তাড়া করছে এক মারণ ব্যাধি,যখন গোটা পৃথিবীর অর্থনীতি ভেঙে পড়ার প্রহর গুনছে,যখন এদেশে অনাহার ক্লীষ্ট মানুষের ছবি প্রতিদিন ভেসে উঠছে চোখের সামনে,তখন অন্তত এদেশের সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়াবার কারিগররা একটু নিরস্ত হবেন।এই ভরসাতেই তো কেউ কেউ  বলে ছিলেন,ভালবাসা না পারলেও মৃত্যুভয় পারবে আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে মুছে দিতে।কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, না পারল না,মৃত্যুভয়ও পারল না এদেশের সাম্প্রদায়িক উসকানিকে স্তব্ধ করতে।শ্মশানে বসেও তাই কেউ কেউ ধর্মীয় বিভাজনের তাস খেলে যাচ্ছে।সামাজিক মাধ্যমের সবকটা ক্ষেত্র হোয়াটসআ্যপ,ট্যুইটার,ফেসবুক সর্বত্র ছড়িয়ে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার গরল।নিপুন দক্ষতায় সেই গরলকে সমাজের সর্বস্তরে নিয়ে যাচ্ছে মৌলবাদী একদল ধর্মান্ধ।দিল্লির নিজামুদ্দিন মসজিদে তবললিগী জামাতের ধর্মপ্রচারকদের জমায়েতের কারণেই এদেশে নাকি করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে,এমনটাই কয়েকদিন ধরে লাগাতার প্রচার করল এদেশের তথাকথিত মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম।শেষ পর্যন্ত অবশ্য আইনি রক্ত চক্ষুর সামনে তাদের থমকাতে হয়।মানতে হয় তারা ভুল ও মিথ্যে খবর প্রচার করেছিল।তথাকথিত মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম যখন মেনে নেয তবলিগী জমায়েত করোনা সংক্রমনের বিপদকে বাড়ালেও সেটাই সংক্রমণ ছড়াবার প্রধান কারণ নয়,ততক্ষনে ভুল বার্তা যা ছড়াবার ছিল তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়ে গেছে।সাম্প্রদায়িকতার বিষ এতদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে যে এ রাজ্যের আটপৌঢ়ে মহিলারা যাঁরা পাড়ার কলে জল আনতে যায় তাঁরাও যাওয়া আসার পথে বলতে শুরু করেন,’ওই মুসলমানগুলোই রোগটাকে গোটা দেশে ছড়িয়ে দিল।’ এদের কোন দোষ নেই,এদের বিষ খাওয়ানো হয়,আর সঠিক তথ্য থেকে অনেক দূরে রাখা হয়।এনারা জানেন না,এনাদের জানতে দেওয়া হয় না যে নিজামুদ্দিন মসজিদের ঐ জমায়েতটা হতেই পরতো না যদি এদেশের সরকার আগে থেকে সকর্ত হোত।এদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অনুমোদন না দিলে ঐ জমায়েত হোত না।এনারা জানেন না শুধু মুসলিম জমায়েত নয় এই লকডাউন পরিস্থিতির মধ্যেই একাধিক জমায়েত করেছেন হিন্দুত্ববাদীরাও।দেশের নানা প্রান্ত। লকডাউনের মাঝেও। এইসব জমায়েতও করোনা সংক্রমণের বিপদকে সমানভাবেই বাড়িয়েছে।এনারা এটাও জানেন না গোটা দেশে যখন করোনা নিয়ে বিপদ ঘন্টা বেজে চলেছে তখনই মধ্যপ্রদেশে একটা নির্বাচিত সরকারকে ভেঙে দিতে কীরকম কুতসিত খেলা খেলেছেন হিন্দুত্ববাতী নেতা নেত্রীরা।আসলে মানুষের জীবন সংশয়,তাঁদের বেঁচে থাকা বা না থাকা নিয়ে এঁরা ভাবিত নয় এরা শুধু ভাবে কীভাবে ক্ষমতার বিস্তার ঘটানো যায়।তাই তো এমন কঠিন সময়ে,এমন ভয়াবহ মুহূর্তে গোটা দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দিতে এদের এমন উদগ্র বাসনা।

    যারা বলছেন এমন সময় এরকম সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ান অনুচিত,তাঁরা বুঝতে পারছেন না সাম্প্রদায়িতকার চাষ যারা করে,হিন্দু মৌলবাদকে সামনে রেখে যারা রাজনৈতিক ক্ষমতাভোগকে নিশ্চিত করতে চায় এই সময়ে তাদের আর বেশী সক্রিয় ও মরিয়া হয়ে ওঠাটা অবধারিত ছিল।তার কারণ ভেবে দেখুন,এই করোনা প্রবাহে গোটা ভারতের আসল চেহারাটা ক্রমশই বেআব্রু হয়ে যাচ্ছে।জাত-ধর্ম-বর্ণ সব বিভাজন রেখাগুলো ক্রমশ মুছে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে শুধু একটাই বিভাজনরেখা-ধনি আর দরিদ্র।একদিকে অপার প্রাচুর্য আর অন্যদিকে না পাওয়ার হাহাকার।পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুটো ভারতবর্ষ।একটা ভারত লকডাউনের আরাম উপোভোগ করছে,আর একটা ভারত রাস্তায় হাঁটছে-মাইলের পর মাইল হাঁটছে।ঘরবন্দি থাকার উপায় নেই তার সে খাবার চায়-বসস্থান চায়-চায় বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ,তাই সে হেঁটে চলে ক্ষতবিত রক্তাক্ত পায়ে সে শুধু হেঁটে চলে।দেশের সমস্ত সম্পদের ৭৩ শতাংশই মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে থাকার ফল যে কী ভয়াবহ ভয়ঙ্কর হতে পারে আজকের ভারতবর্ষ তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।সম্পদের অসম বন্টন অন্তহীন ভয়াবহতা ডেকে আনে–হরর উদাউট এন্ড।

  স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও এদেশের কোটি কোটি পরিবার এতটুকু রসদও য়োগাড় রাখতে পারে নি যা দিয়ে মৃত্যু ভয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তারা কয়েকটা দিন ঘর বন্দি থাকতে পারে।কত মানুষের আবার ঘরই নেই,তাদের আবার ঘর বন্দি।এই হোল এদেশের উন্নয়নের চেহারা,এই হোল ডিজিটাল ইন্ডিয়ার আসল ছবি।পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে দ্বন্দ্বটা আসলে অনেক খাওয়া আর অন্য দিকে না খাওয়ার।এই দ্বন্দ্বটাকেই তো চাপা দিতে চান সাম্প্রদায়িকতার কারবারিরা,সেই জন্যই তো হিন্দু-মসলমানের দ্বন্দ্বটাকে সামনে নিয়ে আসার মরিয়া চেষ্টাটা এই সময়তেই আর বেশী করে করতে হবে বলে স্থির করে ফেলেছেন তারা।সামনের দিনগুলো আর কঠিন হবে তারা বুঝতে পারছেন।এরপর শুরু হবে অর্থনৈতিক মন্দা।দেশজুড়ে চাকরি হারাবেন হজার হাজার মানুষ।এদের সঙ্গে যোগ হবে অভূক্ত অনাহার ক্লিষ্ট মানুষের ক্ষোভ।তাই শাসক দলের নেতা নেত্রীদের দিকে আঙুল ওঠার আগেই সেই আঙুল ঘুরিয়ে দিতে হবে।সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢেলে এদেশের সংখ্যা গরিষ্ট মানুষকে বোঝাতে হবে তাদের দুর্দশার জন্য দায়ী একটি বিশেষ সম্প্রদায়।তাদের শায়েস্তা করতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।তাই বিষ ঢালার এমন সূচারু আয়োজনে মেতে উঠেছেন সাম্প্রদায়িক শক্তির সব পান্ডারা।যুক্তি-বুদ্ধি চেতনা সবকিছুকে অবরুদ্ধ করে এখন শুধু চলছে একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করার পালা।তা না হলে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে রাজ্য সরকারকে এমন একটা চিঠি পাঠানো হবে কেন যেখানে শুধুমাত্র বেছে বেছে এ রাজ্যের মুসলিম প্রধান এলাকাগুলির বাজার অঞ্চলেই সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়?নাগরিকদের সাধারণ অভিজ্ঞতা যেখানে বলে সব বাজারেই সামাজিক দুরত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে সেখানে কোন যুক্তিতে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক শুধু বিশেষ এলাকার বাজারগুলি চিহ্নিত করতে পারে?

   আসল কথাটা হোল েদেশের শাসক দল তাদের কর্মসূচি নির্ধারন করে ফেলেছেন একেবারে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে।প্রথমত তারা একটা বিশেষ সম্প্রদায়কে টার্গেট করবে।দ্বিতীয়ত যে বা যারা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে তাঁদের জেল বন্দি করা হবে নানা অভিযোগ সাজিয়ে।যেমন গত ১৪ তারিখ ধরা হোল আনন্দ তেলতুম্বদেকে।আনন্দ একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ,তিনি বাবা সাহেব আম্বেদকরের বংশধর।বরাবর সরব দলিত ও প্রন্তিক মানুষের অধিকারের পক্ষে।দু বছর আগে এই মানুষটিকেই আর অনেকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।মামলা চলছিল,গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছিল কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা।সুপ্রিম কোর্ট আনন্দের গ্রেপ্তারের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল।সেই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই গত ১৪ এপ্রিল গ্রেপ্তার করা হয় আনন্দকে।১৪ এপ্রিল প্রথম পর্যায়ের লকডাউনের মেয়াদ শেষ হয়।সেদিন অসংখ্য পরিযায়ী শ্রমিক বাড়ি ফিরতে চেয়ে পুলিশের লাঠি খেয়েছে,রক্তাক্ত হয়েছে। তাদের বাড়ি ফেরার বা তাদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করার কোন উদ্যোগ চেখে পড়েনি সরকারের পক্ষ থেকে অথচ মাওবাদী তকমা দিয়ে আনন্দ তেলতুম্বদেকে গ্রেপ্তার করতে উদ্যোগের কোন অভাব ছিল না কেন্দ্রীয় শাসকদের।এটাই হোল কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণের নমুনা।দেশের সরকার তার কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করে ফেলেছে এবার তাই নাগরিকদেরও তাদের অগ্রাধিকার নির্ধারন করতে হবে।কোন পক্ষে থাকবেন তাঁরা সাম্প্রদায়িকতার বিষ মেখে সাম্প্রদায়িক শাসককে ভরসা করবেন নাকি প্রশ্ন তুলবেন ঠিক করতে হবে নাগরিককেই।আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী পোষাক দেখে দাঙ্গাকারীদের চিনতে পারেন বলে জানিয়েছিলেন এবার বোধহয় নাগরিকদেরও জানিয়ে দেওয়ার সময় হয়েছে যে তাঁরাও প্রধানমন্ত্রীর পোষাক দেখে তাঁকে চিনতে পারছেন।অনাহার আর অভুক্ত মানুষের দেশে যে প্রধানমন্ত্রী ১০লাখি শ্যুট গায়ে চড়াতে কুন্ঠিত হন না তিনি যে কাদের প্রতিনিধিত্ব করেন সেটা এদেশের নাগরিকরা চিনে ফেলেছেন।এবার বোধহয় সেটা জানিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে নাগরিকদের পক্ষ থেকে।