কতটা পথ হাঁটলে তবে বাড়িতে ফেরা যাবে…

0
99

সম্পাদকীয়ঃ- ওঁদের আর জানা হল না কতটা পথ হাঁটলে তবে বাড়িতে যাওয়া যাবে,তার আগেই রেল লাইনের উপরে ঘুমিয়ে থাকা ওঁদের শীর্ণ শরীরগুলোকে পিষে দিয়ে গেছে  মাল গাডির চাকা।মহারাষ্ট্রের ঔরাঙ্গবাদের কাছে থেমে গেছে ষোলজন মানুষের বাড়িতে ফেরার উদগ্র আকাঙ্খা। ছিন্ন-ভিন্ন রক্তাক্ত শরীরগুলো দেখে অবশেষে দুঃখ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মৃতের পরিবারের জন্য অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা হয়েছে। তবে তার পরেও জানা গেল না কতটা পথ হাঁটলে তবে বাড়িতে যেতে পারবেন সেই সব মানুষজন যারা কাজের জন্য ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।জানা গেল না কেন মৃত্যুর পর অর্থ সাহায্য করার কথা মাথায় আসছে?কেন বেঁচে থাকতে এই মানুষগুলোর জন্য সামান্যতম দায়বদ্ধতা দেখাতে পারল না আমাদের দেশের সরকার?গত ৪৭ দিন ধরে এদেশের শ্রমিকদের নিয়ে যে ছেলেখেলা চলছে তার জবাব কে দেবে?কেন পরিকল্পনাহীন লকডাউনের মূল্য চুকোতে এদেশের গরিব খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে এভাবে প্রাণ বলি দিতে হবে?কোথায় গেল জনকল্যানকামী রাষ্ট্রের জনকল্যান করার তাগিদ? মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে এভাবে দীর্ঘস্থায়ী লকডাউন ঘোষণার আগে ও পরে দেশের সরকার কেন মানুষের, বিশেষ করে আর্থিকভাবে দূর্বল মানুষের জীবন রক্ষা নিয়ে কোন পরিকল্পনা করবে না?উচ্চবিত্তদের জন্য বিশেষ বিমানে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা হয় অথচ গরিব শ্রমজীবী মানুষের বেলায় সরকার চোখবুজে উদাসীন থাকে কোন যুক্তিতে?কোন যুক্তিতে দেশের অগণিত শ্রমজীবী মানুষ এখন শুধুমাত্র দু পায়ের হাঁটাকে সম্বল করে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে যাবে অভূক্ত-অনাহার ক্লিষ্ট শরীরে?দিন যাবে-মাস যাবে সরকার নীরব বধীর।এ কোন দেশ?কাদের দেশ?কাকেই বা বলে দেশ?

দেশপ্রেম-জাতীয়তাবাদ কথাগুলো বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনকালে বার বার শোনা গেছে।সরকারের যে কোন কাজের সমালোচনাকে দেশবিরোধী বলে দেগে দিয়ে যে কোন সমালোচককে দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করার প্রয়াসও এই আমলেই বেশী করে পরিলক্ষিত হচ্ছে।করোনা সংক্রমণের এই ভয়াবহ আবহে বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকদলের আসল চেহারা ক্রমশ বেআব্রু হয়ে যাচ্ছে,পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে এদেশের শাসক দল আসলে মুষ্টিমেয় উচ্চবিত্তের স্বার্থ রক্ষায় বেশী তত্পর।শিল্পপতি ও ধনকুবেরদের প্রতি বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসক দলের আনুগত্য বার বার চোখে পড়ছে।এখন দেশের গরিব শ্রমজীবীদের প্রতি সরকারের আচরণকে শুধু অমানবিক বললে কম বলা হয়,বলা উচিত দেশের গরিব অসহায় মানুষকে সরকার পরোক্ষে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিতে চাইছে।শুধু মাত্র ঔরাঙ্গবাদে ষোলজনই নয় এর আগেও হাঁটতে হাঁটতে পথেই মারা গেছেন আর ২২জন শ্রমিক।রোজগার বন্ধ,খাবার সংস্থান নেই,পানীয় জল নেই খোলা আকাশের নীচে কতদিন থাকবেন মানুষগুলো!বাড়িতে ফিরতে চাইলে পুলিশের লাঠি আর এক জায়গায় বসে থাকলে নিশ্চিত অনাহারে মৃত্যু।এই দ্বিমুখী আক্রমের সামনে ওঁরা তাই মরিয়া বাড়িতে ফিরতে,হোক হাজার মাইল দূর তবু যদি বাড়িতে ফেরা যায়,যদি পা দুটো সাথ দেয় তবে আবার নতুন করে ছোট ছোট সাধ-আল্লাদগুলোকে বাঁচিয়ে তোলা যাবে,আবার ফুটিফাটা সংসারটাকে টেনে তোলা যাবে,আপনজনের শরীরের গন্ধে অভাবের সংসারে ভালবাসা স্নেহ মমতার অনুভূতিগুলো আবার ডানা মেলবে,হয়তো এই প্রত্যাশাতেই দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে পেরিয়ে যেতে চাইছে ওরা।

তবু ওঁদের মধ্যে অনেকেই আর ফিরবেন না ফিরবেন না ঔরাঙ্গবাদে মালগাড়ির তলায় পিষ্ট হয়ে যাওয়া ষোলজন,ফিরবেন না পথের ক্লান্তিতে পথেই লুটিয়ে পড়ে নিথর হয়ে যাওয়া বাইশজনও।আমরা তবু দেখবো না খাওয়া মানুষের মিছিল চলছে চলবেও।আর নিরাপদ দুরত্বে দাঁড়িয়ে দেখবে আমাদের সরকার,যে সরকার অভুক্ত অনাহার ক্নিষ্ট দেশের প্রধানমন্ত্রীকে দশলাখি স্যুট পড়ার অনুমোদন দেয়,হাজার হাজার কোটি টাকার কর ছাড় দেয় শিল্পপতিদের।না এই ভয়াবহ বৈসম্যে ভরা সমাজ বাস্তবতা আমাদের মধ্যবিত্তের চেতনায় কোন উদ্বেগের আঁচড় কাটবে না,কারণ এ দেশে কলে কারখানায় মাঠে ময়দানে কাজ করা মানুষদের আমরা তো কোন দিন সহনাগরিক ভাবতেই শিখিনি।এই করোনা আবহে লকডাউন না হলে আমরা কি জানতে পারতাম এ দেশের এই তথাকথিত পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনকথা!তাই আমরা ভুলে যাবো, সব ভুলে যাবো। অভূক্ত মানুষের হেঁটে চলার মিছিল আমরা মনে রাখবো না,মনে রাখবো না এমন কী মালগাড়ির নীচে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাওয়া মানুষগুলোকেও।তাই তো এই মানুষগুলোর মৃতদেহের পাশেই এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা ওদের বড় আদরের খাবার বেশ কয়েকদিনের শুকনো রুটি গুলোর পাশেই আমরা নির্দ্ধিধায় আমাদের ফেসবুক পেেজে পোস্ট দেবো লকডাউনের অবকাশে আমাদের ঘরে তৈরি হওয়া নতুন রেসিপির।একদিকে কয়েকদিনের শুকনো রুটিকে সম্বল করে মাইলের পর মাইল হাঁটতে থাকা শ্রমিক অন্যদিকে লকডাউনের আরাম উপভোগ করা নাগরিক সমাজের উপস্থিতি দেখেও আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলে উঠবো, ‘সব কা সাথ সব কা বিকাশ’।তাই কতটা পথ হাঁটলে তবে বাড়িতে যাওয়া যায় তা নিয়ে আমাদের কোন আগ্রহ নেই তার চেয়ে বরং আসুন আমাদের মধ্যবিত্ত চেতনাকে মোলায়েম করে তুলতে আমরা মেনে নিই এই মৃত্যু উপত্যকাই আমাদের দেশ।