পরিকল্পনাহীন লকডাউন ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারেঃ আশঙ্কা ডাঃ ফুয়াদ হালিমের

0
95

সিপিএম নেতা হলেও মূলত তিনি চিকিত্সক।আর সেই পেশাগত দৃষ্টিতেই তিনি ব্যাখ্যা করলেন এদেশের করোনা পরিস্থিতিকে। বললেন পৃথিবীর অন্য দেশগুলি যখন লকডাউনের সুযোগকে ব্যবহার করে করোনা প্রতিরোধের পরিকাঠামো তৈরি করতে ব্যস্ত আমাদের দেশ তখন শুধুমাত্র লকডাউনকেই একমাত্র হাতিয়ার বলে ভেবে চুপ করে বসে আছে,ফলে আমরা এক ভয়াবহ বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছি।তবে এখনও সময় আছে এই বিপদ থেকে মানুষকে উদ্ধার করার,কীভাবে?সে কথাই বললেন ডাঃ ফুয়াদ হালিম সাতদিন সাম্পাদক অনুপম কাঞ্জিলালকে একান্ত আলাপচারিতায়।

 

——————————————————————————————–

সাতদিনঃআমাদের দেশে চতুর্থ পর্যায়ের লকডাউনের নির্ধারিত সময়সীমাও শেষ হয়ে এল।এখনও করোনা সংক্রমণের গ্রাফ ক্রমশই বাড়ছে।যা অন্যান্য দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে মিলছে না।ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সরকার পঞ্চম দফার লকডাউন ঘোষণার দিকে যাচ্ছে।আপনার কি মনে হয় এদেশে লকডাউন ব্যর্থ হচ্ছে?অন্যদিকে এদেশের যা আর্থসামাজিক কাঠামো তাতে দীর্ঘস্থায়ি লকডাউন যে আর বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে সে ইঙ্গিতও বেশ স্পষ্ট।আপনি কী বলবেন?

ফুয়াদ হালিমঃদেখুন লকডাউন ব্যর্থ আমি বলবো না বরং এদেশের গরিব মানুষ তাদের রুজি রোজগার বন্ধ রেখে লকডাউনকে মান্যতা দিয়েছে।তবে এটা নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারি লকডাউনের সুযোগকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে এদেশের সরকার।রাজ্য ও কেন্দ্র দুই সরকারের ক্ষেত্রেই এটা সত্য।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু বার বার বলেছে,করোনাকে প্রতিহত করতে লকডাউনের মধ্যেই লাগাতার পরিকল্পনা করতে হবে।স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং দ্রুততার সঙ্গে টেস্ট-টেস্ট এবং টেস্ট করে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে হু।কিন্তু আমাদের দেশে এই টেস্টিং এর হার একেবারেই কম।অন্যান্য দেশে যখন উপসর্গযুক্ত ও উপসর্গহীন  সব ধরনের রোগীর টেস্ট করিয়ে সংক্রমণের বহর কতটা সে বিষয়ে একটা আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছে আমরা তখন একেবারে অন্ধকারে রয়েছি।মনে রাখবেন আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত করোনা সংক্রমণের যে হদিশ মিলেছে তার ৭৫-৮০ শতাংশই হচ্ছে এদেশের ৩৯টি শহর কেন্দ্রীক।এর পর যখন সংক্রমণ গ্রামের দিকে ছড়াবে তার পরিনাম ভয়াবহ হতে পারে।সরকার তথ্য গোপন করে সেই ভয়াবহতাকে আটকাতে পারবে না।                                 সাতদিনঃতার মানে আপনি আশঙ্কা করছেন আমরা এক ভয়াবহ পরিস্থির মুখে পড়তে পারি?

 ফুয়াদ হালিমঃদেখুন সরকারের যে দায়িত্ব ছিল সরকার তা পালন করে নি।শুধুমাত্র লকডাউন করেই অবস্থা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা।কথা প্রসঙ্গে আপনি জানতে চাইছিলেন তো যে অন্য দেশগুলোতে লকডাউনের ফলে করোনা সংক্রমণ যখন কমছে আমাদের দেশে উল্টো চিত্র কেন?এর কারণ হল অন্য দেশ গুলি লকডাউনের প্রথম পর্যায় থেকেই টেস্টিং এর সংথ্যা দ্রুত গতিতে বাড়িয়েছে ফলে লকডাউনের একটা পর্যায়ের পড়ে তাদের সংক্রমণের সংখ্যা কমেছে বলে দেখা যাচ্ছে সেখানে আমরা লকডাউনের শেষ পর্যায়ে এসে টেস্টিং কিছুটা মাত্র বাডিয়েছি তাই সংক্রমণ বেশি ধরা পড়ছে।অন্যান্য দেশগুলো  প্রতি দশ লক্ষে যে মাত্রায় টেস্ট করাচ্ছে আমরা করাচ্ছি তার অনেক কম।এই টেস্টিং এর নিরিখে আমরা নেপাল পাকিস্থানের চেয়েও পেছিয়ে আছি।তাই আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণের বাস্তব চিত্রটা সম্পর্কে আমরা কার্যত এখনও অন্ধকারেই আছি।অন্যদিকে পরিকল্পনাহীন লকডাউনের ফলে গ্রাম গঞ্জের মানুষ থেকে পরিযায়ী শ্রমিকের একটা বড় অংশের মানুষকে আমরা মারাত্মক অপুষ্টির দিকে ঠেলে দিয়েছি ফলে তাদের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমেছে।এই রকম একটা পরিস্থিতিতে গ্রাম গঞ্জে সংক্রমণ ধরা পড়তে থাকলে তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।তবে আমি বিশ্বাস করি পরিস্থিতি এখনও সামাল দেওয়া সম্ভব,এখনও মানুষকে ভয়াবহ বিপদ থেকে উদ্ধার করা যায়।এখনই উচিত জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য একেবারে যুদ্ধকালীন দ্রুততায় কাজে নেমে পড়া।কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির উচিত এলাকায় এলাকায় স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তোলা,অস্থায়ীভাবে হলেও।টেস্ট এর সংখ্যা দ্রুত বাড়াতে হবে উপসর্গ ও উপসর্গহীন নির্বিশেষে। পর্যাপ্ত টেস্ট কিট মজুত করতে হবে প্রতিটি রাজ্যে।জনস্বাস্থ্য নিয়ে দেশের সরকার যদি তাদের ভাবনার আমূল বদল না আনতে পারে তবে আজকের এই পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছি ইতিহাস তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করবে।পরিযায়ী শ্রমিকদের মর্মান্তিক পরিণতি থেকে সেই ইঙ্গিত পরিষ্কার হচ্ছে।করোনার এই আবহে এদেশের কঙ্কালসার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর চেহারাটাই সামনে চলে এসেছে এটাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি শুধরাবে না তো বটেই আর ভয়ঙ্কর হতে পারে।আমি সেই আশঙ্কা করছি।প্রসঙ্গত বলি,ভাবুন এ রাজ্যে কতজন করোনায় মারা গেছে,ও কী পরিমাণ টেস্ট হচ্ছে সে বিষয়ে সঠিক তথ্য সরকারের কাছে জানতে চেয়ে আমাকে শেষ পর্যন্ত কোর্টে জনস্বার্থ বিষয়ক এক মামলা দায়ের করতে হয়েছে এবং তার পরে এ রাজ্যে করোনায় মৃত শনাক্ত করতে যে তথাকথিত বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি হয়েছিল তা বাতিল হয়।সুতরাং যেখানে সঠিক তথ্য পেতে কোর্টের সাহায্য নেওয়ার দরকার পড়ছে সেখানে সরকার, তা সে কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজ্য সরকার যেই হোক না কেন তারা যে তথ্য গোপন করেই পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে চাপা দেবার চেষ্টা করবে সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে।সরকার যদি সমস্যাকে দেখতেই না চায়,তবে সে সমস্যার সমাধান করবে কীভাবে?আসলে এটাই হল জনস্বাস্থ্য থেকে সরকারের দায় ঝেড়ে ফেলার কৌশল।অনেকদিন ধরে চলে আসা  সরকারি এই কৌশলটাই এখন সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় বিপদ,সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বার্তা নিয়ে হাজির।

 সাতদিনঃআপনার কী মনে হয় এদেশের বা এ রাজ্যের সরকার পরিস্থিতির চাপে আচমকাই তাদের চিরাচরিত কৌশল রাতারাতি বদলে ফেলে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এগিয়ে আসবে?             ফুয়াদ হালিমঃনা মনে হয় না।কিন্তু দরকার হল মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করে তোলা,জনস্বাস্থ্য রক্ষাটা যে সরকারের দায় এটা মানুষকে বোঝাতে হবে।মানুষ দাবি তুলতে থাকলে সরকার সে বিষয়ে মাথা ঘামাতে বাধ্য হবে। সমস্ত রাজনৈতিক দল ও মত নির্বিশেষে নাগরিক সমাজ এই দাবি তুলতে থাকলে সরকারের চিরাচরিত কৌশল ধাক্কা খেতে বাধ্য।      সাতদিনঃ-এ রাজ্যের পরিস্থিতি কী বুঝছেন?                                                             ফুয়াদ হালিমঃ-গোটা দেশে যেমন অন্যান্য দেশে্র তুলনায় টেস্ট কম হচ্ছে,এ রাজ্যে আবার দেশের মধ্যে অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় টেস্ট কম হচ্ছে, গোটা দেশের নিরিখে এদেশে মৃত্যুর হারও অনেকটা বেশী,তাই পরিস্থিতি কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউ জানেন না।মুখ্যমন্ত্রী তথ্য গোপন থেকে ভুল তথ্য দেওয়া কোনটাই বাকি রাখছেন না।আগেই বলেছি কীভাবে তথ্য জানতে কোর্টের সাহায্য নিতে হয়েছে আমাকে।পরিস্থিতি সুবিধার নয়।কিন্তু আমরা আমাদের পার্টির তরফে মানুষের কাছে যাচ্ছি,যতটুকু মানুষের স্বার্থে করা যায় করছি।কেরালা তো এদেশে করোনা প্রতিরোধের একটা মডেল হতে পারে।মানুষের স্বার্থের কথা ভাবলে যে কেউই তো রাজনীতি বাদ দিয়েই সেই মডেলকে অনুসরণ করতে পারেন করা উচিতও।যারা এখন রাজনীতির সময় নয় বলে বার বার বলছেন তারা কেন মানুষের স্বার্থে এদেশে করোনা প্রতিরোধে সবচেয়ে সফল বলে সর্বজন স্বীকৃত রাজ্যের পরামর্শ নিতে এত কুন্ঠা দেখাচ্ছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে না।গোটা দেশ ও রাজ্য নিয়ে যে আশঙ্কা আমার হচ্ছে যেটা লকডাউনের সুযোগ ব্যবহার না করতে পারার জন্য বলে আমি মনে করছি,সেটা সত্যি না হলেই আমি খুশি হব।তবে শুধু শুভকামনার উপর তো আর কিছু নির্ভর করে না এটাই নির্মম বাস্তব ও বিজ্ঞান।                                                                                                    সাতদিনঃ-বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন করোনা প্রতিরোধে শেষ পর্যন্ত,যূথবদ্ধ অনাক্রম্যতা বা হার্ড ইমিউনিটিই একমাত্র হাতিয়ার লকডাউন করে একে আটকানো যাবে না আপনি কী বলবেন।

ফুয়াদ হালিমঃ-লকডাউন হল অতিমারি প্রতিরোধের একটা ধাপ,এই ধাপে প্রতিরোধের উপকরণগুলোকে সাজিয়ে নিতে হয়।এখন কেউ যদি বলেন কোন কিছুর দরকার নেই চলুন আমরা হার্ড ইমিউনিটি দিয়ে সব মোকাবিলা করে নেব,তবে সেটা হবে একেবারে হাঁটু মুড়ে একটা সমস্যার কাছে স্যারেন্ডার করা,এবং একই সঙ্গে  সরকার বা রাষ্ট্রকে তার সব দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া।আমি এই মতের সঙ্গে একমত নই,তবে আমার মনে হয় বিশেষজ্ঞরা আসলে দীর্ঘস্থায়ী লকডাউন সম্পর্কে এই মত দিয়েছেন।অবশ্যই লকডাউন দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া নিয়ে ভাবতে হবে বিশেষ করে আমাদের মত দেশে।লকডাউন একটা সময় দেয় তাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত পরিকল্পনা সাজাতে হয়,পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হয় সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়।আমার দেশ তার কোনটাই করে নি।আমার আশঙ্কা এখন লকডাউনকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়ে তারা এই হার্ড ইমিউনিটির তত্ত্বকে  বিকৃত ভাবে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে নিজেদের অক্ষমতাকে আড়াল করবে।আমাদের সরকার লকডাউনকেই একমাত্র প্রতিষেধক বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছে সেটাই তাদের সবচেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা।এটা সবার কাছে বার বার বলা দরকার।

 সাতদিনঃ-পরিযায়ী শ্রমিকরা রাজ্যে ঢুকলে করোনার প্রকোপ বাড়বে,রাজ্যের প্রান্তিক এলাকাগুলোতেও সংক্রমণ ছড়াবে তাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা যেন আচমকা রাজ্যে না ঢোকে।এমনকী মুখ্যমন্ত্রী এ ব্যাপারে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে তারা রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক ঢুকিয়ে এ রাজ্যে সংক্রমণ বাড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে।আপনারা,মানে সিপিএমও তো পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনার পক্ষে বলছেন,আপনার মনে হয় না এর পর মুখ্যমন্ত্রী আপনাদের বিরুদ্ধেও এ রাজ্যে সংক্রমণ বাড়াবার অভিযোগ তুলবেন?

 ফুয়াদ হালিমঃ-দেখুুন পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য যেন ফুটবল খেলছে বলে মনে হচ্ছে।আমি আগেই বলেছি পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে যে মর্মান্তিক খেলা দেশের সরকার খেলল তা ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।রাজ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে সেই অজুহাতে একদল মানুষকে রাস্তায় ছেড়ে রাখা কোন মানবিকতার রীতির মধ্যে পড়ে?আর সংক্রমণ ছড়াবে কেন,ওদের যাবতীয় দায়িত্ব রাজ্যকে নিতে হবে।ওদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-চিকিত্সা,কোয়ারেন্টাইনের যাবতীয় ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।এটাই তো মানবিক দাবি,আমরা তাই এখনও দাবি করছি রাজ্যের সব পরিযায়ী শ্রমিককে অবিলম্বে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।

 সাতদিনঃ-সব শেষে চিকিত্সক ফুয়াদ হালিমের কাছে জানতে চাইবো মানুষকে করোনা প্রতিরোধে কিছু বলতে চাইবেন কী?

   ফুয়াদ হালিমঃ-নতুন কথা কিছু নয় চিকিত্সক হিসেবে একই কথা বলবো,যত কম দামেরই হোক একটা সাবান সঙ্গে রাখুন।বার বার হাত ধোওয়ার অভ্যেস করুন।আর খুব চেষ্টা করুন মুখে,চোখে,নাকে যখন-তখন হাত না দেওয়ার।কয়েকদিন একটু সচেতন হন দেখবেন বিষয়টাতে রপ্ত হয়ে উঠবেন।অন্তত দু মিটার দূরে দাঁড়িয়ে অন্যের সঙ্গে কথা বলা অভ্যেস করুন। শরীরকে সচল রাখুন।

ছবিঃটুইটার থেকে নেওয়া