সুশান্ত সিং রাজপুত আপনার জন্য খোলা চিঠি লিখলেন  অনুপম কাঞ্জিলাল           

0
101

 

সুশান্ত সিং রাজপুত আপনি আমার এই চিঠি কোনদিন আর পড়বেন না জেনেও আপনাকে উদ্দেশ্য করেই এই চিঠি লিখছি।এই চিঠির অভিঘাত শুধু আপনাতেই থেমে থাকবে না,তা সমাজের গভীরে বিস্তৃত হবে সেই বিশ্বাসেই এই লেখা।সুশান্ত আপনি জীবন থেকে পালিয়েছেন,জীবনের প্রতি গভীর নিঃস্পৃহতা আপনাকে আত্মহননে প্রোরেচিত করেছে।আপনার অবসাদ,আপনার অপমান,আপনার প্রেমঘটিত নানা সমস্যা ও সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রির নেপটিজম নিয়ে নানা তথ্য মিডিয়ায় প্রতিদিন সামনে আসছে আর তা নিয়ে চলছে তুমুল তর্ক-বিতর্ক।শুনতে কঠিন লাগলেও একটা কথা পরিষ্কার বলে রাখি সুশান্ত, এই তর্কে আমার কোন রুচি নেই।আর এই রুচি হীনতাকে এই সময়ের প্রেক্ষিতে আমি খুব পবিত্র ও নির্মল বলেই বিবেচনা করছি। এই সময়ে অবসাদ জনিত আত্মহননের কোন তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়েও আমার কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ এ দেশের কয়েকশ  শ্রমিক জীবনের ন্যূনতম চাহিদা না মেটা সত্ত্বেও বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্খা নিয়েও কেন মৃত্যুর সঙ্গে সখ্য তৈরিতে বাধ্য হল তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।সুশান্ত আপনি মাত্র ৩৪ বছরের জীবনে আপনার মধ্যবিত্ত শ্রেনী অবস্থান ও মেধার সহায়তায়  অনেক কিছু পেয়েছিলেন নাম যশ অর্থ প্রতিপত্তিও,আর ভাবুন তো হাজার হাজার মাইল পথ পায়ে হেঁটে যারা শুধু মাত্র ঘরে ফিরতে চেয়েছিল,দীর্ঘ পথ চলার ক্লান্তিতে যারা রেল লাইনের উপরই ঘুমিয়ে পড়েছিল তাদের পিযে দিয়ে গেল মাল গাড়ির চাকা।সুশান্ত আপনার মৃত্যুর চেয়েও ঐ শ্রমিকদের মৃত্যু আমাকে অনেক বেশী বেদনার অভিঘাত দেয়।আমি আর বেশী রাগি উত্তেজিত হই যখন দেখি আমাদের মধ্যবিত্ত অধ্যুযিত জগত এই ধারাবাহিক শ্রমিক মৃত্যুকে গুরুত্বহীন বলে এড়িয়ে চলতে প্ররোচিত করে সমস্ত সমাজকে।এ দেশের অগণিত শ্রমিক যাদের গাল ভরা নাম দিয়ে বলা হচ্ছে পরিযায়ী তারা তীব্র জীবন পিপাসা থাকা সত্ত্বেও বাঁচতে পারবেন না রাষ্ট্র ও সমাজের উদাসীনতায়,আর সুশান্ত আপনারা জীবনের প্রতি নিঃস্পৃহ হয়ে আত্মহনন করেও আলোচনায় থেকে যাবেন দিনের পর দিন এ কেমন কথা!সুশান্ত আপনি সেলিব্রিটি তাই আলোচনায় থাকবেন বাজারের নিয়মই তাই,কিন্তু তার পরেও প্রশ্ন থাকবে সাধারণ মানুষ ছাড়া বাজার টিঁকে থাকতে পারে কি?

        সুশান্ত আপনি মৃত্যুর আগে জামলো মকদমের নাম শুনেছিলেন?বোধহয় শোনেন নি,আসলে জামলো মকদমের মৃত্যুর খবর তো খবরের কাগজের প্রথম পাতায় জায়গা পায় না,একদিন পর সেই খবরের কোন আপডেটও পাওয়া য়ায় না তাই আপনি হয়তো জামলো মকদমের জীবন কাহিনিটা জেনে যেতে পারেন নি।শুনুন জামলো মকদম ১২ বছরের একরত্তি একটা মেয়ে।১২ বছর বয়সেই সে বুঝে যায় গতর না খাটালে তার বেঁচে থাকা কঠিন,তাই ছত্তিশগড়ের বিজাপুর থেকে ১৫০ কিমি দুরে তেলেঙ্গানার এক ক্ষেতে কাজে যায় সে।লকডাউন পর্বে সে ফিরতে চেয়ে পায় হাঁটতে শুরু করে আর সেই পথ চলার ধকল ছোট্ট শরীরটা নিতে পারে নি বাড়ির খুব কাছে এসে পথেই লুটিয়ে পড়ে মারা যায় জামলো মকদম।জামলো বেঁচে থাকতে চেয়েছিল,তাই শৈশবেই কঠিন পরিশ্রম করা শুরু করেছিল,জীবনের কোন চাহিহা না মেটা সত্ত্বেও এরা কারোর কাছে কোন নালিশ করেনি,নিজেদের শরীরকেই বাজি ধরেছিল জীবন পিপাসা চরিতার্থ করতে।সুশান্ত এইসব   জীবন যুদ্ধের সামনে আপনার সমস্যাকে নেহাতই গৌণ মনে হওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক?আপনি কী সেই দৃশ্যটা দেখেছিলেন সুশান্ত রেল লাইনে  পড়ে থাকা শ্রমিকদের রক্তাক্ত দেহগুলির পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা সেই শুঁকনো রুটি গুলো,সে গুলো ওরা বড় যত্নে গুছিয়ে রেখেছিল বাড়ি ফেরার পথে খাবার রসদ হিসেবে।আপনি বলুন তো কে বা কারা হতে পারে আমাদের প্রেরণা,আপনাদের মত সব পেয়েও জীবন থেকে পালিয়ে যেতে চাওয়া অভিনেতা,নাকি বেশ কয়েক দিনের শুকনো রুটি ঝোলায় নিয়েও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখা সেই সব নাম না জানা শ্রমিকের দল? না সুশান্ত আপনার কাছ থেকে নয় জীবন প্রেমের শিক্ষাটা আমরা ওই শ্রমিকদের কাছ থেকেই নেবো।যারা হাজার হাজার মাইল পথ পায়ে হেঁটে ঘরে ফিরছে,যে মহিলা পথে হাঁটতে হাঁটতে সন্তানের জন্ম দিয়ে আবার বাড়ি ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াচ্ছেন,তারাই চেনাবে জীবন প্রীতি।

সুশান্ত আপনি খুব ভীরু মেরুদন্ডহীন তাই এভাবে পালিয়ে যেতে পারলেন আপনাকে নিয়ে তাই আলোচনা এড়িয়ে আমি জীবন সংগ্রামী মানুষের জীবন নিয়ে আলোচনা চাই,তাদের মৃত্যুর কৈফিয়ত চাই,চাই এই চাওয়ার মানুষের সংথ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে যেতে।সুশান্ত আপনি চাঁদেও জমি কিনতে পেরেছিলেন,আর জামোলো মকদমদরা, তারা তো এ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামেও একখন্ড বাসস্থানের য়োগাড় করতে পারে না।তবু তারা বেঁচে থাকতে চায়,বেঁচে থাকার স্বপ্ন সাজায় প্রতিদিন নতুন নতুন করে।আপনি বলুন সুশান্ত,আপনাদের মত যারা বেঁচে থাকার সব উপকরণ থাকা সত্ত্বেও বেঁচে থাকতে চান না তাদের মৃত্যু নিয়ে প্রস্ন ও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশী জরুরি নয় কি যারা বেঁচে থাকতে চেয়েও বেঁচে থাকতে পারে না তাদের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তোলা?