এর দায় কোন সভ্য সরকার এড়াতে পারে না

0
132

সাতদিন ডেস্কঃ করোনা অাবহে অন্য ব্যাধিতে অাক্রান্ত  রোগীদের কী নিদারুণ পরিণতি হচ্ছে তা সোশ্যাল মিডিয়াতে তুলে ধরছেন একজন। অামরা তাঁর সেই অভিজ্ঞতা হুবহু প্রকাশ করলাম।

আমি কাল আমার দিদির মৃত্যু এবং তা নিয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছি৷ আজ আরও লিখছি কারণ আরও কিছু বলা-লেখা বাকি আছে৷
আমরা অনেক বড় ফ্যামিলি, আমাদের লোকবল, টাকাপয়সা, চেনা ডাক্তারদের কোনো কমতি নেই।

পিয়ারলেস, অ্যাপেক্স, মেডিকা, রেমেডি ইত্যাদিতে ঘোরার পর আমরা ঢাকুরিয়া আমরিতে একটা বেডের খবর পেয়েছিলাম সন্ধ্যে নাগাদ। ঢাকুরিয়ার রাস্তায় ব্যারিকেড। পুলিশ গাড়ি আটকায়৷ নিউমোনিয়া পেশেন্ট, ইমার্জেন্সি, শ্বাসকষ্ট সব বলা হয়, পুলিশ উত্তর দেয়, “আমরা জানিনা, আমরা যেতে দিতে পারব না”। গাড়ি ঘুরিয়ে এসএসকেএম যাওয়া হয়, সেখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, ভাঙড়ে যাওয়া হয় তারপর। সেখানে বলা হয়, “করোনা পেশেন্ট নয়, তাই নেব না। স্বাস্থ্যদপ্তরে কথা বলুন”। এই একই কথা কেপিসি মেডিক্যাল হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীও বলেন। এরপর বাঘাযতীনের অ্যাঞ্জেল হাসপাতালে যাওয়া, সেখানে কোনো ব্যবস্থাই নেই। বাঘাযতীনের আইরিশ হাসপাতালে যাওয়া হয় তারপর, তারা কিছু টেস্ট করেন। তার মধ্যে সিটি স্ক্যানও ছিল। আমরা নিশ্চিন্ত হই যে এখানে ভর্তি নেওয়া হবে। সব টেস্টের পর ৮০০০ টাকার বিল ধরানো হয় এবং বলা হয়, “পেশেন্ট নিয়ে চলে যান।” আমরা বহু বহু বলেছি৷ কিন্তু রাখা হল না আল্টিমেটলি৷ শেষমেশ বাঘাযতীন স্টেট জেনারেল হাসপাতালে আসতে বাধ্য হই। এক ঘন্টা ধরে সেখানে জেরা করা হয়, “করোনা হয়েছে কি না, সুগার আছে কি না, কোলেস্টেরল আছে কি না, রিপোর্ট দেখান”…একটু অক্সিজেনের ব্যবস্থা করার জন্য হাতে পায়ে ধরে আমার জামাইবাবু, বাবা, দাদা। শেষে তারা ভর্তি নেন। অক্সিজেন দেওয়া হয়, দিদি তখন একটু আরাম পায়। কিন্তু আধ ঘন্টার মধ্যে বলেন রোগী নিয়ে চলে যেতে৷ আবার বেডের খোঁজ শুরু হয়৷ আমাদের যত ডাক্তার, যত হাসপাতালকর্মী চেনা ছিল, তাদের রেকমেন্ডেশানেও কোনো কাজ হয়নি। ভাল গান করত আমার দিদি। এই গানের লাইনে চেনা কিছু লোক ছিল। তারা এরপর ঠাকুরপুকুরের এক হাসপাতালে ৪৫০০০ টাকা পার ডে’তে বেডের খোঁজ দেন। সেখানে নেবার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ও আর টানতে পারল না। অ্যাম্বুলেন্সেই শেষ হয়ে গেল।
ওর শেষ কথা, “চিনিকাকু (আমার বাবা), আমায় ভাল জায়গায় নিয়ে চল। টাকার চিন্তা কোরো না। অয়ন (ওর হাজব্যান্ড) সব দিয়ে দেবে।” কিন্তু এত ঘন্টা নর্মাল একটা এসি গাড়িতে সারা শহর ঘোরার জন্য ওর যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে৷
রাতে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি নম্বরে পাগলের মত ফোন করেছি আমি আর ছোটকা৷ রুবি, উডল্যান্ড, ফরটিস, বেলভিউ, কোঠারি, আর এন টেগোর সব সব জায়গাতে৷ আমার কাকা বাধ্য হয়ে মিথ্যে বলেছে, যে ও করোনা পেশেন্ট। এতেও কাজ হয়নি। ইমার্জেন্সি নম্বরে ৬ মিনিট অপেক্ষা করানোর পর বলেছে, বেড নেই।
আমি বুঝছি, হয়ত ওকে বাঁচানো খুব কষ্টকর ছিল। হয়ত বাঁচত, লাংস সারাজীবনের জন্য ড্যামেজড হত। হয়ত বাঁচত না। কিন্তু একটু অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা যেত না, এটা মানতে পারছি না। ওর ৫ বছরের একটা বাচ্চা, নিজের বয়স মাত্র ৩৬। কঠিন কোনো রোগ নয়, ছোঁয়াচে কোনো রোগ নয়। সামান্য নিউমোনিয়ায় একটা মানুষ, যে সকালে সামান্য রান্নাবান্না করল, যে কি না সন্ধ্যের সময় হেঁটে (কষ্ট করে) গাড়িতে উঠল, সেই মানুষটা চলে গেল।

এত বড় শহর কলকাতা, ইন্ডিয়ার অন্যতম নামী শহর, সারা পৃথিবী চেনে এমন শহরে একটা অক্সিজেন সাপোর্ট পাওয়া যায় না, নিউমোনিয়া পেশেন্ট ট্রিটমেন্ট হয় না।
আমি প্রথমেই বলেছি, আমাদের লোকবল, চেনা মানুষ, টাকাপয়সা কোনকিছুর কমতি নেই। আমরা কিন্তু আমাদের পেশেন্টকে বাঁচাতে পারিনি। পরিচিত মানুষের থেকে শুনলাম জার্নালিস্ট সুমনও(এবিপি) একই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছে। কিন্তু সে তো সেলিব্রিটি মানুষ, তার বন্ধুর মায়ের চিকিৎসা হয়েছে৷ কিন্তু আমরা আপনারা সাধারণ মানুষ, আমাদের কোনো বড় জায়গাতে চেনা জানাও নেই। আমাদেরই বিপদ সবচেয়ে বেশী।

আপনারা সাবধানে থাকুন। ছোটোখাটো কোনো কিছু নেগলেক্ট করবেন না। না নিজেকে, না আপনার আশেপাশের কাউকে। যত প্রিকশান নেওয়া যায়, ততটাই নিন। সামান্যতম অসুবিধে হলেও চেনা ডাক্তারকে দেখান। দেরি করবেন না। সামান্যতম অসুবিধে হলেও শিয়রে সংক্রান্তির মত উঠেপড়ে লাগুন। আমরা যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেলাম, যা হারালাম, তা ভাবনার অতীত। আমি চাই না, আজ আমাদের যে কষ্ট হচ্ছে, আর কারো বুকে এই এক কষ্ট এইভাবে বাজুক।

আমি ভয় দেখাচ্ছি না। ভয় দেখানো আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি এও জানি, ফেসবুকে প্রতিবাদ হয় না, আমি তার চেষ্টাও করছি না। আমার সেই মানসিক দৃড়তা, কাঠিন্য নেই আর। তাতে যদি মনে হয় আমি দুর্বল, তাহলে আমি তাইই। কিন্তু আমি চাই সবাই সতর্ক হোন। জানুন, বুঝুন যে অব্যবস্থায় ভরে গেছে সমস্ত জায়গা। আমরা সেলিব্রিটি নই। সাধারণ মানুষ। আমাদের বাঁচানোর জন্য ব্যবস্থা খুব, খুব, খুব কম। এখন তো বেশীরভাগ নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, ৫/৬ সদস্য ম্যাক্সিমাম। আমরা ২০ জনের ফ্যামিলি। এ ছাড়াও প্রচুর আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী, পাড়ায় যথেষ্ট প্রভাব আছে আমাদের ফ্যামিলির। এত মানুষ মিলেও কিছু করতে পারিনি। আপনারা সময় থাকতে সতর্ক হোন, জানুন, বাঁচুন। অন্যদের সাহায্য করুন যতটুকু পারবেন, যেভাবে পারবেন। আপনারা ভাল থাকুন।